আজ || বুধবার, ২৪ Jun ২০২৬
শিরোনাম :
  গোপালপুর প্রেসক্লাবের সংবাদকর্মীদের সঙ্গে নবাগত ইউএনও’র মতবিনিময়       গোপালপুরসহ সারাদেশে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন       গোপালপুরে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের উদ্যোগে মাদকবিরোধী সভা অনুষ্ঠিত       তালের শাঁস বিক্রি করে সচ্ছলতার মুখ দেখছেন গোপালপুরের রবি       গোপালপুর পৌরসভায় কোরবানির বর্জ্য শতভাগ অপসারণ       মনে পড়ে ব্রহ্মপুত্র নদীপাড়ের রানার মানিকের কথা       গোপালপুরে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন       শিপন রানা ৪৬তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম       নুরানী তালিমুল কুরআন বোর্ড বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ কর্মশালা       গোপালপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উপজেলা প্রশাসনের জরুরী মিটিং    
 


পথেই যার ঠিকানা

মো: শামছুল আলম চৌধুরী :

রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলি। প্রায়ই দেখা হয় ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ এক অসহায় নারীর সাথে। দৃষ্টি তার পথিকের দিকে। কাউকেই কিছুই বলে না, শুধু অবলীলায় তাকিয়ে থাকেন। পথেই তার আস্তানা। শীতে জীর্ণ কাপড় মুড়ি দিয়ে থাকেন, রাত কাটান সেখানেই। মাঝে মাঝে একা একাই কিছু একটা বিরবির করে আওড়িয়ে যান, বুঝা যায় না। আমার পকেটে ৫০.০০ (পঞ্চাশ) টাকার কয়েকটি নোট থেকে একটি নোট তাকে দেই। কড়কড়ে নোট ওলট-পালট করে দেখে কাপড়ের ভাজে রেখে দেন।

মনে পড়ে আড়ং এর সামনেই রয়েছে ছোট্র একটা ছাতিমগাছ। তাতে এখনো ফুল রয়েছে। অদ্ভুত এই গাছটি সেই যে, ১৭ই অক্টোবর থেকে ফুল ফুটছে এখনো মঞ্জুরীতে ফুল রয়েছে, সুবাস ছড়াচ্ছে। তবে কার্তিকের সন্ধ্যায় যেমনি ঘ্রাণ ছড়াতো এখন আর তেমনি নাই। ভাবলাম, বৃদ্ধা মহিলাটি যদি ছাতিমের নিচে অবস্থান নিতো, তবে তার শ্বাসকষ্টের হয়ত কিছুটা লাঘব হতো, সেইসাথে ছাতিম ফুলের সুবাসও পেতেন। কিন্তু তিনি তার এই আস্তানা ছেড়ে কোথাও যাবেন না। এখানেই তিনি প্রায় ১০ (দশ) বছর ধরে রয়েছেন। নাম জিজ্ঞেস করতেই, দরকার নেই জানালেন। আবারো জিজ্ঞেস করলাম।

– কেয়া।
– বাবা-মা-ভাই-বোন?
– হেঁসে কুটিকুটি! ঐ দূরে, জানিনা।
– বাড়ি কোথায়?
– এখানেই!
আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে বললেন
এখানে একটা কম্বল ছিল (মাথার নিচে ইজ্ঞিত করে) নাই! বুঝতে পারলাম শীতে তার কম্বল প্রয়োজন। পরদিন রবিবার, ১৪ই ডিসেম্বর ২০২৫ সবুজ রঙ্গের একটি কম্বল নিয়ে কেয়ার গাঁয়ে জড়িয়ে দিতেই হেঁসে উঠলেন। পেশাদার সৈনিকের মত হাত তুলে সালাম দিলেন।

১৪ই ডিসেম্বর। স্বাধীনতা।
কথা শুনে আমার মনে প্রশ্ন জেগে উঠলো, পথে যার বসবাস, প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীন একজন বয়স্কা নারী, তিনি ১৪ ডিসেম্বর, স্বাধীনতা এগুলো দিয়ে কী বোঝাতে চাচ্ছেন। প্রশ্ন করলে কোনো সদুত্তর পেলাম না।  জানিনা হয়তোবা মহান স্বাধীনতা ১৯৭১ এর সাথে তার কোনো সুখ-দুঃখের স্মৃতি রয়েছে, যা নিয়ে তিনি এখনো অতীত খুঁজে চলছেন। কিংবা সেজন্যই তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে আজকের এই অবস্থায় রয়েছেন এবং রাজপথেই তার ঠিকানা হয়েছে। পাশের ভ্যানের তৈজসপত্র বিক্রেতা ময়মনসিংহের সুতিয়াখালির আব্দুল কুদ্দুস (৫৩) কে কেয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আজ তিন বছর ধরে তিনি কেয়াকে এভাবেই দেখছেন। কেউ তার খবর নিতে আসে না। হয়ত তার কেউ নেই। তবে মাঝে মাঝে  একজন লোক এসে তাকে কিছু দিয়ে যায়।
অসহায় একজন নারীর আস্তানা জৌলুসপূর্ণ রাজধানীর মানুষের চলার পথের পাশেই। ব্যস্ততম এই আড়ং রোডে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাফেরা করে। গাড়ি, পোশাক, অর্থ ব্যয় করে দামি কেনাকাটা করে, কিন্তু কেয়ার খবর কে রাখে? প্রার্থিব জীবনে এসব কোনো কিছুরই কেয়ার প্রয়োজন নাই। জীবনের কঠিন আস্বাদন নিয়ে এই রাজপথেই তার দিন কাটে, রাত পোহায়! কিন্তু কারো কাছে তিনি কোনো কিছুরই প্রত্যাশা করেন না। এ তার ব্যক্তিত্ব আর আত্মসম্মানের বহি:প্রকাশ। বর্তমানে আমাদের সমাজের সম্মানবোধ, মর্যাদাবোধ এ সকল ভুলন্ঠিত হয়ে এখন আমরা পারস্পরিক সম্পর্কের ছেদ ঘটিয়ে অন্যের সম্পদ হরণ, গৃহছাড়া করা, হিংসা-বিদ্বেষ রাহাজানি এসকলে উন্মাধনায় মত্ত হয়েছি। ফলে বিবেকের মৃত্যু হয়ে আমরা অনেকেই এখন অমানুষের কাতারে এসেছি। মত-পথের পার্থক্য হয়েছে অনেক, মমত্ববোধ কমে গিয়ে নিজের পরিবারের ভিতরেই রক্তের হোলি খেলায় মত্ত হয়ে পুরো সমাজ অস্তিরতার পর্যায়ে এসেছে। যা নিকট অতিতেও ছিল না। বন্ধন ছিল দৃঢ়, এখন হয়েছে শিথিল। আগে কারো মৃত্যুতে পুরো গ্রাম অনেকদিন শোকের আবহ বইত, আর এখন সম্পর্কের শিথিলতা নৈতিকতার অবক্ষয়ের জন্য মৃত্যুতে উল্লাস উন্মাদনা চলে। এর অবসান হবে কবে? পাঠকের কাছে প্রশ্ন রেখে ‘কেয়া’ যেনো এই শীতে ভাল থাকেন, সুস্থ থাকেন এই কামনায় শেষ করছি।

লেখক :
মো: শামছুল আলম চৌধুরী
অতিরিক্ত সচিব (অবঃ)

মন্তব্য করুন -


Top
error: Content is protected !!